বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশে গত ২৭ বছরে (১৯৯৫-২০২১ সাল) প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু হার ৭১ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে প্রতি এক লাখ জীবিত সন্তান প্রসব করতে গিয়ে ৫৭৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো। কমতে কমতে সর্বশেষ ২০২১ সালের সরকারি জরিপে তা নেমে এসেছে ১৬৮ জনে। কিন্তু শুরুতে যে হারে কমেছে, ধীরে ধীরে তাতে ভাটা পড়েছে এবং মাতৃমৃত্যু কমার হার বিগত সময়গুলোর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি মন্থর হয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসফিআরএস) জরিপ অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে ১ লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ৫৭৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো। ২০০৪ সালে ১০ বছরের মাথায় তা নেমে আসে ৩৭২ জনে। অর্থাৎ এই ১০ বছরে মাতৃমৃত্যু হার কমেছে ৩৫ শতাংশ। এরপর পরে ২০১৪ সালে ১ লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ২১৪ জন মায়ের মৃত্যু হতো। সেই ১০ বছরে মাতৃমৃত্যু হার কমার গতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময় বছরে ৪ শতাংশ হারে মাতৃমৃত্যু কমেছে।
এমনকি মাতৃমৃত্যু হার গত এক বছরে কমার পরিবর্তে বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে প্রতি লাখ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ১৬৩ জন মায়ের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে ২০২১ সালে তা বেড়ে ১৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এই এক বছরে মাতৃমৃত্যু হার বেড়েছে ৩ শতাংশ।
এমন অবস্থাকে দেশের নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ২০৩০ সাল নাগাদ সরকারের টেকসই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মাতৃমৃত্যু ৭০ জনে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে মাতৃমৃত্যু হার অনেক ধীরগতিতে কমছে। কমার যে অনুপাত তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যুতে ৭০ জন নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কারণ এখন বছর অনুপাতে মাতৃমৃত্যু কমছে ১ শতাংশের কিছু বেশি। ধীরে ধীরে এই হার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। ২০২৩ সাল নাগাদ প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু ১০০-তে নামিয়ে আনা যাবে কি না, সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এ ব্যাপারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক ও মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একমাত্র যদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব শতভাগ করতে পারি, তখন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব। মাতৃমৃত্যু কমার ধীরগতির প্রধান কারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের অভাব।
বাংলাদেশ অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক রোগী, অনেক রোগ, নানা ধরনের ঝুঁকি, তাতে মাতৃমৃত্যু কমার হার কিছু কমতে পারে। কিন্তু কমার যে গতি তা আরও বাড়াতে হবে। আমরা সেজন্য কাজ করছি। এখনো মূল বাধা হোম ডেলিভারি বা বাড়িতে প্রসব। আমরা এসব মাকে কিছুতেই হাসপাতালে আনতে পারছি না, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব করাতে পারছি না। এমনকি অনেক মা একেবারে শেষ মুহূর্তে আসে, তখন অবস্থা খুবই খারাপ থাকে, বাঁচানো যায় না।’
এখনো ৫০% প্রসব বাড়িতে হচ্ছে : বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, এখনো বাংলাদেশে সন্তান প্রসবের ৫০ শতাংশ বাড়িতে হচ্ছে। বাকি যে ৫০ শতাংশ মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হচ্ছে, তাদের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে হচ্ছে ১৪ শতাংশ, বেসরকারি পর্যায়ে ৩২ শতাংশ ও এনজিওর ব্যবস্থাপনায় ৪ শতাংশ।
বেসরকারি হাসপাতালে প্রসবের ৮৪ শতাংশই হচ্ছে সিজারিয়ান, সরকারি হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ সিজারিয়ান ও এনজিওতে ৪০ শতাংশ সিজারিয়ান হচ্ছে।
স্বাভাবিক প্রসব বেশি হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে, যা প্রসবের ৬৪ শতাংশ, এনজিওতে হচ্ছে ৬০ শতাংশ ও বেসরকারি পর্যায়ে স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে মাত্র ১৬ শতাংশ।
এ ব্যাপারে ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, প্রতি বছরে এখন মাতৃমৃত্যু ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে কমছে। এই হার ধীরগতির। কারণ প্রথমদিকে যারা হাসপাতালে যান তাদের বাঁচানো সম্ভব, এমন মায়ের সংখ্যা ৫০ শতাংশ। বাংলাদেশে এখন ৫০ শতাংশ মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হচ্ছে। বাকি ৫০ শতাংশ মাকে অনেক দিন চেষ্টা করেও হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না, তাদের বাড়িতে প্রসব হচ্ছে। পারিবারিক, আর্থিক ও সামাজিক এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার কিছু গাফিলতির কারণেও তারা সন্তান প্রসবে হাসপাতালে আসছেন না। এই ৫০ শতাংশ মাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের আওতায় না আনা পর্যন্ত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে না।
সামনে হার আরও মন্থর হবে : ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, ‘দিন যত যাবে, মাতৃমৃত্যু হার কমার গতি আরও ধীরগতির হবে। ১৯৯৫ সালের দিকে বাড়িতে প্রসব হতো শতভাগ। এখন হচ্ছে ৫০ শতাংশ। গত ২৫-৩০ বছরে আমরা মাত্র ৫০ শতাংশ মাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব সেবা দিতে পারছি। বাকি যে ৫০ শতাংশ তারা সহজেই হাসপাতালে আসতে চান না। সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সিজারিয়ান ও আর্থিক ব্যাপারেও ভয় পান। ফলে গত ২৫ বছরে যে ৫০ শতাংশকে আমরা হাসপাতালে নিতে পেরেছি, আগামী ২৫ বছরে আমরা সেই হারে হাসপাতালে নিতে পারব না। এজন্য মাতৃমৃত্যুর প্রতিরোধের গতি অনেক কমে যাবে।’
এসব মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য: পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন এমন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও গবেষকরা বলছেন, এসব মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। ২০২১ সালের বিডিএইচএসের এসভিআরএস তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাতৃমৃত্যু প্রতি লাখে ১৬৮ জন। এটা অনেক বেশি ভয়াবহ। কারণ এই মৃত্যুটা প্রতিরোধ করা যায়। একজন সুস্থ মা শুধু সন্তান প্রসব জটিলতার কারণেই মারা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, ‘এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু ৭০-এ নামাতে চাই। ২০১৯ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন ২০৪১ সালের মধ্যে তিনটি বিষয় শূন্য করবেন। এর মধ্যে একটি হলো মাতৃমৃত্যু। এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকার কাজ করছে।’
মাতৃমৃত্যুর ৫ কারণ: মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাতৃমৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এ ব্যাপারে ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, মাতৃমৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণের মধ্যে একটি প্রসবোত্তর রক্তপাত বা প্রসবকালীন হেমারেজ (পিপিএইচ)। প্রসবের আগে বা প্রসবের সময় রক্তক্ষরণ শুরু হলে বাড়িতে প্রসবের ব্যবস্থাপনা করা যাবে, এমন নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। অবশ্যই তাকে হাসপাতালে আনতে হবে। কারণ এ ধরনের মায়েদের বাড়ি থেকে হাসপাতালে নিতে নিতেই মৃত্যু হয়। মাতৃমৃত্যুর ৩১ শতাংশ পিপিএইচের কারণেই হচ্ছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, দ্বিতীয় কারণ একলামশিয়া বা খিঁচুনি। এতে ৪ শতাংশ মা মারা যান। একজন মায়ের যদি খিঁচুনি হয়, এমনকি তাকে যদি হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়, তার পরও ১৬ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর এসব মা মারা যান। এসব মায়ের কিছুতেই বাড়িতে ব্যবস্থাপনা করা যাবে না।
এই কর্মকর্তা বলেন, তৃতীয় কারণ ডেলিভারির পরে সংক্রমণ। এ কারণে ৭ শতাংশ মা মারা যান। চতুর্থ কারণ বিলম্বিত প্রসব। এ কারণে ৩ শতাংশ মা মারা যান। তবে এসব কারণে মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ অনিরাপদ গর্ভপাত। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩৩ লাখ মা গর্ভধারণ করে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৭ লাখ মায়ের অনিরাপদ গর্ভপাত হয়। কারও কারও মতে এই সংখ্যা ১৫ লাখ। এ কারণে ৭ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়।
ডা. জাহাঙ্গীর আলম প্রধান বলেন, আমরা যদি মায়েদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব করাতে পারি, মায়ের যথাযথ সেবা দিতে পারি, তাহলে এসব মাকে বাঁচাতে পারি। মাতৃমৃত্যুর যে প্রধান পাঁচটি কারণ রয়েছে, সবগুলোই প্রতিরোধ করা সম্ভব একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের মাধ্যমে। বিশেষ করে সরকারের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে বিনামূল্যে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা রয়েছে।